চিরকুমার-সভা
তা ভাই, দুর্গা নিজের বর খুঁজতে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে তপস্যা করেছিলেন; কিন্তু নাতনীদের বর জুটছে না বলে আমি বুড়োমানুষ খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেব, বড়োমার এ কী বিচার। আহা শৈল, ওটা মনে আছে তো? তদপ্যপাকীর্ণমতঃ প্রিয়ংবদাং—

শৈলবালা। মনে আছে দাদা, কিন্তু কালিদাস এখন ভালো লাগছে না।

রসিক। তা হলে তো অত্যন্ত দুঃসময় বলতে হবে।

শৈলবালা। তাই তোমার সঙ্গে পরামর্শ আছে।

রসিক। তা, রাজি আছি ভাই। যেরকম পরামর্শ চাও তাই দেব। যদি হাঁ বলাতে চাও হাঁ বলব, না বলাতে চাও না বলব। আমার এই গুণটি আছে। আমি সকলের মতের সঙ্গে মত দিয়ে যাই বলেই সবাই আমাকে প্রায় নিজের মতোই বুদ্ধিমান ভাবে।

অক্ষয়। তুমি অনেক কৌশলে তোমার পসার বাঁচিয়ে রেখেছ, তার মধ্যে তোমার এই টাক একটি।

রসিক। আর- একটি হচ্ছে ‘যাবৎ কিঞ্চিন্ন ভাষতে’— তা, আমি বাইরের লোকের কাছে বেশি কথা কই নে।

শৈলবালা। সেইটে বুঝি আমাদের কাছে পুষিয়ে নাও?

রসিক। তোদের কাছে যে ধরা পড়েছি।

শৈলবালা। ধরা যদি পড়ে থাক তো চলো, যা বলি তাই করতে হবে।

রসিক। ভয় নেই দিদি। এমন দুটি কুলীনের ছেলে জোগাড় করেছি কন্যাদায়ের দুঃখের চেয়েও যারা হাজারগুণ অসহ্য। তাদের দেখলে বড়োমা তাঁর মেয়েদের জন্য এ বাড়িতে চিরকুমারী-সভা স্থাপন করবেন। যাই, তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন।

[ প্রস্থান

শৈলবালা। মুখুজ্জেমশায়।

অক্ষয়। আজ্ঞা করো।

শৈলবালা। কুলীনের ছেলে দুটোকে কোনো ফিকিরে তাড়াতে হবে।

অক্ষয়। তা তো হবেই।—

গান

দেখব কে তোর কাছে আসে—

তুই রবি একেশ্বরী, একলা আমি রইব পাশে।

শৈলবালা। (হাসিয়া) একেশ্বরী?

অক্ষয়। নাহয় তোমরা চার ঈশ্বরীই হলে, শাস্ত্রে আছে : অধিকন্তু ন দোষায়।

শৈলবালা। আর, তুমিই একলা থাকবে? ওখানে বুঝি অধিকন্তু খাটে না?

অক্ষয়। ওখানে শাস্ত্রের আর-একটা পবিত্র বচন আছে সর্বমত্যন্তগর্হিতং।

শৈলবালা। কিন্তু মুখুজ্জেমশায়, ও পবিত্র বচনটা তো বরাবর খাটবে না। আরো সঙ্গী জুটবে।

অক্ষয়। তোমাদের এই একটি শালার জায়গায় দশশালা বন্দোবস্ত হবে? তখন আবার নূতন কার্যবিধি দেখা যাবে। ততদিন কুলীনের ছেলেটেলেগুলোকে ঘেঁষতে দিচ্ছি নে।

চাকরের প্রবেশ

চাকর। দুটি বাবু এসেছে।

[ প্রস্থান