নৌকাডুবি

উমেশ কহিল, “তিনি ভালো আছেন।”

কমলা। আমার দিদি কেমন আছেন?

উমেশ। মা, তিনি তোমার জন্য কাঁদিয়া অনর্থ করিতেছেন।

তৎক্ষণাৎ কমলার দুই চোখ জলে ভরিয়া গেল। জিজ্ঞাসা করিল, “উমি কেমন আছে রে? সে তার মাসিকে কি মাঝে মাঝে মনে করে?”

উমেশ কহিল, “তুমি তাহাকে যে এক-জোড়া গহনা দিয়া আসিয়াছিলে সেইটে না পরাইলে তাহাকে কোনোমতে দুধ খাওয়ানো যায় না। সেইটে পরিয়া সে দুই হাত ঘুরাইয়া বলিতে থাকে ‘মাসি গ-গ গেছে’, আর তার মার চোখ দিয়া জল পড়িতে থাকে।”

কমলা জিজ্ঞাসা করিল, “তুই এখানে কী করিতে আসিলি?”

উমেশ কহিল, “আমার গাজিপুরে ভালো লাগিতেছিল না, তাই আমি চলিয়া আসিয়াছি।”

কমলা। যাবি কোথায়?

উমেশ কহিল, “মা, তোমার সঙ্গে যাইব।”

কমলা কহিল, “আমার কাছে একটি পয়সাও নাই।”

উমেশ কহিল, “আমার কাছে আছে।”

কমলা। তুই কোথায় পেলি?

উমেশ। সেই যে তুমি আমাকে পাঁচটা টাকা দিয়াছিলে, সে তো আমার খরচ হয় নাই।

বলিয়া গাঁট হইতে পাঁচটা টাকা বাহির করিয়া দেখাইল।

কমলা। তবে চল্‌ উমেশ, আমরা কাশী যাই, কী বলিস? তুই তো টিকিট করিতে পারিবি?

উমেশ কহিল, “পারিব।” বলিয়া তখনি টিকিট কিনিয়া আনিল। গাড়ি প্রস্তুত ছিল, গাড়িতে কমলাকে উঠাইয়া দিল; কহিল, “মা, আমি পাশের কামরাতেই রহিলাম।”

কাশী স্টেশনে নামিয়া কমলা উমেশকে জিজ্ঞাসা করিল, “উমেশ, এখন কোথায় যাই বল্‌ দেখি?”

উমেশ কহিল, “মা, তুমি কিছুই ভাবিয়ো না; আমি তোমাকে ঠিক জায়গায় লইয়া যাইতেছি।”

কমলা। ঠিক জায়গা কী রে! তুই এখানকার কী জানিস বল্‌ দেখি।

উমেশ কহিল, “সব জানি। দেখো তো কোথায় লইয়া যাই।”

বলিয়া কমলাকে একটা ভাড়াটে গাড়িতে তুলিয়া দিয়া সে কোচবাক্সে চড়িয়া বসিল। একটা বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াইলে উমেশ কহিল, “মা, এইখানে নামো।”

কমলা গাড়ি হইতে নামিয়া উমেশের অনুসরণ করিয়া বাড়িতে প্রবেশ করিতেই উমেশ ডাকিয়া উঠিল, “দাদামশায়, বাড়ি আছ তো?”

পাশের একটা ঘর হইতে সাড়া আসিল, “কে ও, উমেশ না কি! তুই কোথা থেকে এলি?”

পরক্ষণেই হুঁকা হাতে স্বয়ং চক্রবর্তী-খুড়া আসিয়া উপস্থিত। উমেশ সমস্ত মুখ পরিপূর্ণ করিয়া নীরবে হাসিতে লাগিল। বিস্মিত কমলা ভূমিষ্ঠ হইয়া চক্রবর্তীকে প্রণাম করিল। খুড়ার খানিকক্ষণ মুখে আর কথা সরিল না; তিনি কী যে বলিবেন, হুঁকাটা কোন্‌খানে রাখিবেন, কিছুই ভাবিয়া পাইলেন না। অবশেষে কমলার চিবুক ধরিয়া তাহার লজ্জিত নতমুখ একটুখানি উঠাইয়া