মেঘনাদবধ কাব্য
পড়ি নাই। দ্বিতীয়ত, কালিকার পদযুগ বক্ষে ধরিয়া মহাদেব চিৎকার করিতে থাকেন এ ভাবটি অতিশয় হাস্যজনক। তৃতীয়ত ‘নাদেন’ শব্দটি আমাদের কানে ভালো লাগে না। প্রমীলা সখীবৃন্দকে সম্ভাষণ করিয়া বলিতেছেন-

লঙ্কাপুরে, শুন লো দানবী

অরিন্দম ইন্দ্রজিৎ বন্দীসম এবে।

কেন যে দাসীরে ভুলি বিলম্বেন তথা

প্রাণনাথ, কিছু আমি না পারি বুঝিতে?

যাইব তাঁহার পাশে, পশিব নগরে

বিকট কটক কাটি, জিনি ভুজবলে

রঘুশ্রেষ্ঠে;–এ প্রতিজ্ঞা, বীরাঙ্গনা, মম,

নতুবা মরিব রণে–যা থাকে কপালে!

দানব-কুল-সম্ভবা আমরা, দানবী;-

দানব কুলের বিধি বধিতে সমরে,

দ্বিষৎ শোণিত-নদে নতুবা ডুবিতে!

অধরে ধরিলা মধু গরল লোচনে

আমরা, নাহি কি বল এ ভুজ-মৃণালে?

চলো সবে রাঘবের হেরি বীর-পনা

দেখিবে যে রূপ দেখি শূর্পণখা পিসি

মাতিল মদন মদে পঞ্চবটী বনে; ইত্যাদি

প্রমীলা লঙ্কায় যাউন-না কেন, বিকট কটক কাটিয়া রঘুশ্রেষ্ঠকে পরাজিত করুন-না কেন, তাহাতে তো আমাদের কোনো আপত্তি নাই, কিন্তু শূর্পণখা পিসির মদনদেবের কথা, নয়নের গরল, অধরের মধু লইয়া সখীদের সহিত ইয়ার্‌কি দেওয়াটা কেন? যখন কবি বলিয়াছেন-

কী কহিলে বাসন্তি? পর্বতগৃহ ছাড়ি

বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে,

কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি?

যখন কবি বলিয়াছেন–‘রোষে লাজ ভয় ত্যজি, সাজে তেজস্বিনী প্রমীলা।’ তখন আমরা যে প্রমীলার জলন্ত অনলের ন্যায় তেজোময় গর্বিত উগ্র মূর্তি দেখিয়াছিলাম, এই হাস্য-পরিহাসের স্রোতে তাহা আমাদের মন হইতে অপসৃত হইয়া যায়। প্রমীলা এই যে চোক্‌ ঠারিয়া মুচকি হাসিয়া ঢল ঢল ভাবে রসিকতা করিতেছেন, আমাদের চক্ষে ইহা কোনোমতে ভালো লাগে না!

একেবারে শত শঙ্খ ধরি

ধ্বনিলা, টঙ্কারি রোষে শত ভীম ধনু

স্ত্রীবৃন্দ, কাঁপিল লঙ্কা আতঙ্কে, কাঁপিল

মাতঙ্গে নিষাদী, রথে রথী তুরঙ্গমে

সাদীবর; সিংহাসনে রাজা; অবরোধে